আমাদের অর্থনীতিতে বেকারত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বড় একটি সংকট। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশযোগ্যতা লাভ করে। তাদের মধ্যে অনেকেই কাজ পায় না, অনেকে পেলেও যথাযোগ্য কাজটি পায় না কিংবা অনেকেই কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিক পায় না। বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান আর দারিদ্র্য বিমোচন যেহেতু একই সূত্রে গাঁথা, তাই এখানে অব্যাহত বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে, বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংকট চলছে। ডলার সংকট ও এর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য হারে ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়নি। বিদেশী বিনিয়োগও খুব বেশি বাড়েনি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপর, সেভাবে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। যদিও প্রতি বছর কর্মক্ষম বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরির বাজারে যুক্ত হলেও তাদের একটি বড় অংশই কাজ না পেয়ে বেকার থাকছে।
বাংলাদেশের বিষয়ে আমরা খুব সহজেই আত্মতুষ্টিতে ভুগি। কিন্তু অর্থনীতির গতি, ব্যবসার গতি, সামাজিক সূচক—কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। দারিদ্র্য উল্টো পথে হাঁটছে, ছদ্ম বেকারত্ব মহামারী আকার ধারণ করেছে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়েছে। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম (বিবিএফ) আয়োজিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় ও এফবিসিসিআইয়ের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এসব কথা উঠে এসেছে।
ছদ্ম বেকারত্ব বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অন্যতম সমস্যা, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি দুর্বল দিককে তুলে ধরে। এটি এমন এক ধরনের বেকারত্ব, যেখানে ব্যক্তি কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত থাকলেও তার শ্রম বা দক্ষতা প্রকৃত উৎপাদনে তেমন অবদান রাখে না। দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ চাকরির অভাবে বা কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় তাদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচু স্তরের পেশায় নিযুক্ত হচ্ছেন। এতে তাদের দক্ষতা ও উৎপাদন ক্ষমতার অপচয় ঘটছে, যা ছদ্ম বেকারত্বের আরেকটি রূপ। ফলে তারা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কর্মরত হয়েও কার্যত কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। এভাবে ছদ্ম বেকারত্ব বাংলাদেশের শ্রমশক্তির অপচয় ঘটাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ হারে। যদিও একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও তাদের বেশির ভাগই ছায়া বা ছদ্ম বেকার বা আংশিক বেকার। অর্থাৎ তাদের শ্রমশক্তি পুরো কাজে আসছে না।
দেশে গত দেড় দশকে সেভাবে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়নি। এমনকি তথাকথিত উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময়েও জিডিপির অনুপাতে কর্মসংস্থান বাড়েনি। আবার শ্রমবাজারে শোভন চাকরির অভাব রয়েছে। কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সিংহভাগই রয়েছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ঋণ প্রবৃদ্ধি না হওয়া, বিনিয়োগস্বল্পতা, জ্বালানির অভাব ইত্যাদি কারণে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলেও সরকারি খাতেও খুব বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, গত বছরের শুরুতে বেকার মানুষ কম থাকলেও বছরের শেষে ধারাবাহিকভাবে এ সংখ্যা বেড়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার রয়েছেন। ২০২৩ সালের একই সময়ে গড় বেকার সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় এ লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। অর্থবছর শেষে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। নিকট অতীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এতটা ভাটা দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৭ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে আর ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ প্রবৃদ্ধির ভাটা। সুদের হার বেশি হওয়ায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ গ্রহণের হার কমে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ খাতে স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা সরাসরি কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণপ্রবাহ কমে গেলে উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারান। এতে শুধু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিনিয়োগ কম হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পর্যাপ্ত ঋণের অভাবে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ও অনেক সময় ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে ও অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন ব্যবসাবান্ধব আর্থিক নীতি, সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করা। অন্যথায় বিনিয়োগের নিম্নগতি ও কর্মসংস্থানের সংকট দীর্ঘমেয়াদে ছদ্ম বেকারত্বের হার আরো বাড়াবে।
অর্থনীতির প্রতিটি খাত চক্রাকারে একে অন্যকে প্রভাবিত করে। তাই একটা সমস্যার সমাধান ছাড়া অন্য সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়ে। বেকারত্ব দূর করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে বিনিয়োগও আবশ্যক। আর বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে প্রয়োজন এর প্রতিবন্ধকতাগুলো, যেমন জ্বালানি সংকট, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করা। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
কেবল কারো কর্মজীবী হওয়া মানেই যে তার পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান হয়েছে তা নয়। বরং কাজের ধরন, সময়, আয় ও সামাজিক সুরক্ষা—এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, দেশের অনেক মানুষ এখনো নিরাপদ ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের বাইরে। ছদ্ম বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। নীতিনির্ধারকদের কার্যকর উদ্যোগই পারে এ বেকারত্ব সমস্যা মোকাবেলা করে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করতে।